অনলাইন ডেস্ক:
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে সন্তান জন্মদানের নতুন নতুন পদ্ধতি সামনে এসেছে। এর মধ্যে Surrogacy (স্যারোগাসি) একটি বহুল আলোচিত বিষয়, যেখানে অর্থের বিনিময়ে বা এমনিতে অন্য একজন নারী গর্ভধারণ করে সন্তান প্রসব করেন; কিন্তু ইসলাম যেহেতু নসব (বংশপরিচয়), বৈবাহিক সম্পর্ক ও মাতৃত্ব বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট বিধান দিয়েছে, তাই প্রশ্ন উঠে— সন্তান জন্মদানের জন্য অন্য নারীর গর্ভ ভাড়া দেওয়া কি শরিয়তসম্মত, নাকি নিষিদ্ধ?
‘না’, স্যারোগাসি তথা সন্তান জন্মদানের জন্য অন্য নারীর গর্ভ ভাড়া করার মাধ্যমে সন্তান জন্মদান শরিয়তসম্মত তো নয়ই বরং ইসলামি শরিয়ায় সর্বসম্মতিক্রমে তা নিষিদ্ধ ও হারাম। আর সন্তান জন্মদান যদি IVF (টেস্টটিউব বেবি)-এর মাধ্যমে বিশ্বস্ত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে হয় তবে তা জায়েজ ও বৈধ হবে। যেখানে ডিম্বাণু ও শুক্রাণু স্বামী–স্ত্রীর হয় এবং গর্ভধারণও স্ত্রীর শরীরেই হয়।
স্যারোগাসি কী?
স্যারোগাসি বলতে বোঝায়— কোনো নারী অন্য দম্পতির সন্তানের জন্য গর্ভধারণ করেন, সন্তান জন্মের পর শিশুটি জেনেটিক বাবা–মায়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এটি সাধারণত দুইভাবে হয়ে থাকে—
১. Traditional Surrogacy – স্যারোগেট নারী নিজেই ডিম্বাণু দেন
২. Gestational Surrogacy – ডিম্বাণু ও শুক্রাণু স্বামী–স্ত্রীর, শুধু গর্ভ অন্য নারীর। ইসলামে স্যারোগাসির উভয় পদ্ধতিই হারাম ও নিষিদ্ধ।
ইসলামের মৌলিক নীতি: বংশ ও মাতৃত্ব সংরক্ষণ
কুরআনের নির্দেশ
নসব তথা কার সন্তান কে—এই বৈধ ও শরিয়তসম্মত পরিচয় নিয়ে কৃত্রিম বা বিভ্রান্তিকর পদ্ধতি ইসলাম গ্রহণ করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন—
مَا جَعَلَ اللّٰهُ لِرَجُلٍ مِّنۡ قَلۡبَیۡنِ فِیۡ جَوۡفِهٖ ۚ وَ مَا جَعَلَ اَزۡوَاجَكُمُ الّٰٓیِٴۡ تُظٰهِرُوۡنَ مِنۡهُنَّ اُمَّهٰتِكُمۡ ۚ وَ مَا جَعَلَ اَدۡعِیَآءَكُمۡ اَبۡنَآءَكُمۡ ؕ ذٰلِكُمۡ قَوۡلُكُمۡ بِاَفۡوَاهِكُمۡ ؕ وَ اللّٰهُ یَقُوۡلُ الۡحَقَّ وَ هُوَ یَهۡدِی السَّبِیۡلَ
‘আল্লাহ কোনো মানুষের বুকে দু’টি অন্তর সৃষ্টি করেননি। তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যাদের সঙ্গে তোমরা জিহার কর, তিনি তাদের তোমাদের জননী করেননি, আর তিনি তোমাদের পোষ্য পুত্রদের তোমাদের পুত্র করেননি, এগুলো তোমাদের মুখের বুলি, আল্লাহই বলেন সত্য কথা, আর তিনিই দেখান (সঠিক) পথ।’ (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ৪)
মাতৃত্বের সংজ্ঞা
ইসলামের দৃষ্টিতে যিনি সন্তান প্রসব করেন, তিনিই মা— এখানে জেনেটিক ও গর্ভধারণের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলে শরিয়ত মারাত্মক জটিলতায় পড়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
اِنۡ اُمَّهٰتُهُمۡ اِلَّا الّٰٓیِٴۡ وَلَدۡنَهُمۡ
‘তাদের মাতা তো কেবল তারাই যারা তাদের জন্ম দিয়েছে।’ (সুরা আল-মুজাদালাহ: আয়াত ২)
হাদিসে এসেছে—
الْوَلَدُ لِلْفِرَاشِ
‘সন্তান সেই পুরুষেরই, যার বৈধ দাম্পত্য শয্যা রয়েছে।’ (বুখারি ৬২৯৩)
সুন্নাহর আলোক, স্যারোগাসিতে এই নীতি লঙ্ঘিত হয়, কারণ সন্তান বৈধ দাম্পত্যের গর্ভে নয়, বরং তৃতীয় পক্ষের গর্ভে জন্ম নেয়।
স্যারোগাসি বৈবাহিক সীমার লঙ্ঘন
ইসলামে সন্তান জন্মের একমাত্র বৈধ পথ হলো নিকাহ। ভ্রূণ স্ত্রী ছাড়া অন্য নারীর গর্ভে প্রবেশ করানোও এই সীমা লঙ্ঘনের শামিল। আল্লাহ তাআলা কুরআনে উল্লেখ করেন—
وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ إِلَّا عَلَىٰ أَزْوَاجِهِمْ
‘মুমিনরা নিজেদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে, কেবল তাদের স্ত্রীদের জন্য ব্যতীত।’ (সুরা আল-মুমিনূন: আয়াত ৫–৬)
ফিকহি সিদ্ধান্ত (সমকালীন আলেমদের ঐকমত্য)
ইসলামিক ফিকহ একাডেমি (OIC) قرار مجمع الفقه الإسلامي অনুযায়ী—
‘যে কোনো ধরনের স্যারোগাসি হারাম ও বাতিল।’ (মজমু আল ফিকহ আল ইসলামি ১৬/৪)
কারণসমূহ—
> বংশপরিচয়ে বিশৃঙ্খলা
> একাধিক মাতৃত্বের দাবি
> নারী দেহকে পণ্য বানানো
> ভবিষ্যৎ সামাজিক ও উত্তরাধিকার জটিলতা
IVF (টেস্টটিউব বেবি) ও স্যারোগাসির পার্থক্য
IVF জায়েজ বা বৈধ, যদি—
> ডিম্বাণু ও শুক্রাণু স্বামী–স্ত্রীর হয়
> গর্ভধারণও স্ত্রীর শরীরেই হয়
এখানে কোনো তৃতীয় পক্ষ যুক্ত হয় না, বংশ বা পরিচয় বিভ্রান্ত হয় না। তবে এ প্রক্রিয়া কেবল বৈধ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে, সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন হতে হবে।
কিন্তু ডিম্বাণু ও শুক্রাণু স্বামী–স্ত্রীর হয় আর গর্ভ যদি অন্য নারীর হয়, তাহলে তা স্যারোগাসি এবং সর্বসম্মতিক্রমে ইসলামে তা হারাম।
সংক্ষিপ্ত ফিকহি সিদ্ধান্ত হলো—
> স্যারোগাসির মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়া শরিয়তসম্মত নয়
> এটি কুরআন–সুন্নাহর স্পষ্ট নীতির বিরোধী
> প্রায় সব সমকালীন আলেম ও ফিকহ একাডেমির মতে স্যারোগাসি হারাম
ইসলাম মানবজাতির কল্যাণ ও সমাজের পবিত্রতা রক্ষার জন্য নসব, মাতৃত্ব ও বৈবাহিক সম্পর্ককে অত্যন্ত সংরক্ষিত রেখেছে। স্যারোগাসি যদিও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি পদ্ধতি, কিন্তু তা শরিয়তের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই সন্তানের জন্য কষ্ট হলেও একজন মুমিনের কর্তব্য হলো— আল্লাহর নির্ধারিত সীমার ভেতর থেকেই চিকিৎসা গ্রহণ করা এবং তার ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা।