নিজস্ব প্রতিবেদক:
শরীর যখন একে একে থেমে যাচ্ছিল, তখনও যাঁর চিন্তা থামেনি— যিনি প্রমাণ করে গেছেন, অক্ষমতা কখনো ব্যর্থতা নয়—বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং-এর জীবনগাথা দিয়েই শুরু হয় সিলেট আর্ট এন্ড অটিস্টিক স্কুল-এর বার্ষিক মূল্যায়ন অনুষ্ঠান ২০২৫। সোমবার (২২ ডিসেম্বর) জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে বিকাল ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় অনুপ্রেরণা, আবেগ ও সাফল্যের এক গভীর মিলনমেলায়। হকিংয়ের জীবনের গল্প উপস্থিত অভিভাবক ও অতিথিদের মনে নতুন করে বিশ্বাস জাগিয়ে তোলে—বিশেষ শিশুরাও সুযোগ ও সহায়তা পেলে পৃথিবী বদলে দিতে পারে।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই একটি ব্যতিক্রমী ও আশাব্যঞ্জক ঘোষণা দেওয়া হয়। সিলেট আর্ট এন্ড অটিস্টিক স্কুলের লেভেল ৪ সফলভাবে সম্পন্নকারী চারজন বিশেষ শিক্ষার্থীকে সিলেট আর্ট এন্ড অটিজম ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ২০২৬ সালের জন্য এক বছরের ভলান্টিয়ার কাজের সুযোগ প্রদান করা হয়। নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা হলেন— আফরোজা আক্তার লামিশা, নাদিয়া আক্তার ইফা, মাহবুব ই জামিল চৌধুরী ইফাজ, এবং হুবায়ুব হোসনে তানজিম।
এই উদ্যোগকে বিশেষ শিশুদের আত্মনির্ভরতার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন আয়োজকরা।
অনুষ্ঠানে লেভেল ১, লেভেল ২, লেভেল ৩ ও লেভেল ৪-এ উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের হাতে সমাপনী সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়। প্রতিটি সনদ যেন বহন করছিল অসংখ্য ঘণ্টার থেরাপি, ধৈর্য আর অদম্য বিশ্বাসের গল্প।
বিশেষ শিশুদের এই যাত্রায় অবিচ্ছেদ্য অংশীদার অভিভাবকদের সম্মান জানিয়ে ২০২৫ সালের অভিভাবক সম্মাননা প্রদান করা হয়।
লেভেল ১-এর অভিভাবক সম্মাননা পান মোছা: তাসলিমা রশিদ ও মারজানা আক্তার, লেভেল ২-এর অভিভাবক সম্মাননা পান মনিকা সরকার ও রাজনা বেগম, লেভেল ৩-এর অভিভাবক সম্মাননা পান চঞ্চল রায় শুভ এবং লেভেল ৪-এর অভিভাবক সম্মাননা পান মাহিদা আক্তার।
আয়োজকদের ভাষায়, “সব অভিভাবকই তাঁদের সন্তানের জন্য জীবনের শেষ শক্তিটুকু পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত। আজ এই ছয়জন অভিভাবক সকল অভিভাবকদের প্রতিনিধিত্ব করে সম্মাননা গ্রহণ করেছেন।”
এরপর সম্মান জানানো হয় বিদ্যালয়ের নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকবৃন্দকে। ২০২৫ সালের শিক্ষক সম্মাননা পান— সক্রিয় শিক্ষক জহুরা আক্তার প্রমা, দায়িত্ববান শিক্ষক রুমা বেগম, উদ্যমী শিক্ষক রেজাউল করিম, সৃজনশীল শিক্ষক এনরউজ বিশ্বাস পাপ্পু, প্রেরণাদায়ক শিক্ষক নাহিদুল ইসলাম এবং নেতৃত্বদানকারী শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা পান সিনিয়র শিক্ষক ঈশিতা রায়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হ্যারল্ড রশীদ চৌধুরী, সভাপতি, সিলেট আর্ট এন্ড অটিজম ফাউন্ডেশন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব শামছুল বাশিত শেরো, কার্যকরী কমিটির সদস্য; জমির আহমেদ, অভিভাবক সদস্য; এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইসমাইল গনি হিমন। বক্তৃতায় তাঁরা বিশেষ শিশুদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সম্মাননা পর্ব শেষে বিদ্যালয়ের বার্ষিক প্রকাশনা “প্রজ্ঞা”-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এই প্রকাশনায় অটিজম ও প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক গবেষণাধর্মী লেখা, অভিভাবকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং হৃদয়স্পর্শী কেস স্টাডি স্থান পেয়েছে।অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে বিশেষ শিশুদের অংশগ্রহণে মনোমুগ্ধকর সংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে। সেই পরিবেশনা যেন হকিংয়ের জীবনের গল্পের সাথেই মিলিয়ে দিল একটাই বার্তা—বিশ্বাস পেলে, ভালোবাসা পেলে, সীমাবদ্ধতাও শক্তিতে রূপ নেয়।